June 29, 2022

Knight TV

fight for justice

৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে রাজধানীর পাঁচ নদী

কৃতজ্ঞতায় – মাহমুদ আকাশ – সংবাদ

ঢাকার চারপাশের নদীর তীরে ছোট-বড় ৭ হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি বা ৩৩০ টন বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গাসহ ৫টি নদীর পানি। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ শিল্প বর্জ্য, ৩০ শতাংশ সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও ইউনিয়ন পরিষদের ড্রেনের বর্জ্য, বাকি ১০ শতাংশ গৃহস্থালী ও অন্যান্য বর্র্জ্য। এর ফলে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমানণ শূন্যের কোটায় মেনে এসেছে। বর্তমানে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট এলাকায় দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমাণ শূন্য দশমিক ২৪ মিলিগ্রাম। বিষাক্ত পানির কারণে মাছ ও পোকামাকড়সহ কোন প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারছে না।

এভাবে দূষিত হওয়ার কারণে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ১০টি নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা একটি। এই নদীর পানিতে ক্ষতিকর পদার্থ ক্রোমিয়াম, আয়রন ও জিংকের মত ভারী ধাতু রয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)’র বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ রোধে একটি কর্ম পরিকল্পনার প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি নৌমন্ত্রণালয়ের এক আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সভায় এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সংস্থাটি। তাই বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকা চারপাশের নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছে নৌমন্ত্রণালয়। তবে নদী দূষণ প্রতিরোধে সরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এই জন্য নদী রক্ষা কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা পরামর্শ তাদের।

বিআইডব্লিউটিএ’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদী প্রতিদিন মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। এই দূষণের ফলে নদীর পানি তার স্বাভাবিক রং হারিয়ে ফেলেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০০৭ অনুযায়ী মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম বা তা বেশি। কিন্তু বর্তমানে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট এলাকায় দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমান শূন্য দশমিক ২৪ মিলিগ্রাম, ধোলাইখালের ফরিদাবাদ এলাকায় আছে শূন্য দশমিক ৭৯ মিলিগ্রাম, শ্যামপুর খালের মুখে আছে শূন্য দশমিক ৯৮ মিলিগ্রাম, পাগলা ওয়াসা ট্রিটমেন্ট প্লান্টে নির্গত ড্রেনের ভাটিকে অক্সিজেন আছে শূন্য দশমিক ৫৬ মিলিগ্রাম, পাগলায় এলাকায় আছে শূন্য দশমিক ৬৩ মিলিগ্রাম, মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে অক্সিজেন আছে শূন্য দশমিক ২৯ মিলিগ্রাম এভাবে বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণের অক্সিজেন আছে গাবতলী ব্রিজের নিচে ২ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। এছাড়া ঢাকার চারপাশের অন্য নদী তুরাগ, বালি, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর পানি দূষণের কারণে দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমাণ খুবই বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এদিকে ঢাকার চারপাশের ১৮৫টি উৎসমুখ দিয়ে প্রতিদিন এই বর্র্জ্য নদীতে পড়ছে। এই উৎসমুখগুলো বন্ধ ও নদীর নাব্যতা রক্ষায় সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে ২০০৯ সালে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। এই কমিটি গত ১০ বছরের ৪৩টি বৈঠক করে একাধিক সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও ঢাকার চারদিকে এই ১৮৫টি বর্জ্যরে উৎসমুখ বন্ধ করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানায়।

এ বিষয়ে বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন বলেন, ঢাকা চারপাশের নদী দখল ও দূষণ রোধে হাইকোর্টে নির্দেশনা অনুয়াযী কাজ করলেই সম্ভব। আদালত বলেছেন নদী কমিশনকে শক্তিশালী করা। সরকার আন্তরিক হলে অনেক কিছু সম্ভব। নদী রক্ষা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু টাস্কফোর্সের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। নদী সিমানা পিলার বসানো নিয়ে অনেক আপত্তি রয়েছে। তা সামাধানে আবার নতুন করে সীমানা পিলার স্থাপন করা হচ্ছে। নদী রক্ষায় এই আগে ২০০৯ হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। সরকার এই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে অনেক কিছু সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদী রক্ষা কমিশনকে সবাই নিয়ে কাজ করতে হবে।

দূষণের কারণ :

ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণের কারণ হিসেবে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়, শিল্প বর্জ্যরে আউটলেটসমূহ স্যুয়ারেজের সঙ্গে সংযোগ হওয়ায় সরাসরি বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এছাড়া কেমিক্যাল ইন্ডাষ্টিজ, টেক্সটাইলের রং, প্রিটিং, ওয়াসিং, ট্যানারি, হাসপাতা, নদীর তীরে এলাকায় হাটবাজার ও মার্কেট থেকে পচা ফলমূল, নৌযানের কালো তৈল, পোড়া মবিল এবং মানব সৃষ্ট বর্জ্য সরাসরি নদীর পানিতে পড়ছে। হাসপাতাল বর্জ্যে থেকে এন্টোবায়টিক, এমক্সসিলিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লাসিলিন ও এ্যাজিথ্রোমাইসনের মতো উচ্চ মাত্রায় এন্টিবায়টিক বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে পাওয়া গেছে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান এম. মাহবুব উল ইসলাম বলেন, নদী দূষণরোধে সম্মেলিত ভাবে কাজ করতে হবে। প্রথমে দূষণের উৎসমূল বন্ধ করতে হবে। ঢাকা চারপাশের নদীর তীরে বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিভি নেই। থাকলেও তা ব্যবহার করে না। নদীর তীর দূষণরোধে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের তীরের বর্জ্য অপসারণের সচেতনতা মূলক কর্মসূচি আমরা করছি।

এদিকে নৌবাহিনীর একটি কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীর তীরে এসব শিল্প-কারখানার ৯৯ ভাগেরই তরল বর্জ্যরে পানি শোধনাগার নেই। এর মধ্যে খোলামুড়া-মীরকাদিম পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার বুড়িগঙ্গা নদীর পানি অত্যন্ত দূষিত। এই নদীর বর্তমান প্রশস্ততা ২৩০-৩৪০ মিটার ও নাব্যতা ১২ ফুট। নদীটির তলদেশে প্রায় ১০-১২ ফুট ঘনত্বের পলিথিনের স্তুপ জমা হওয়ায় প্রাকৃতিক উপায়ে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে নদীর পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যহত হচ্ছে। এতে নদীটির পানি কালো বর্ণের এবং অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ছে। উত্তরখান থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ টঙ্গী খাল ও আশুলিয়া থেকে খোলামুড়া পর্যন্ত ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তুরাগ নদীটি অত্যন্ত দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মীরকাদিম থেকে গোপচর পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার ধলেশ^রী নদীটিও হালকা দূষিত চিহ্নিত করা হয়েছে। গোপচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ শীতলক্ষ্যা ও উত্তরখান থেকে ডেমরা পর্যন্ত ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বালু নদীটি উচ্চমাত্রায় দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ নদীর তীরে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসমূহের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদী প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। বাণিজ্যিক ও আবাসিক বর্জ্য ছাড়াও এই নদী দু’টিতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। বুড়িগঙ্গার পানি পরীক্ষার রিপোর্টে ক্রোমিয়াম, নাইট্রেট, সিসা ও উচ্চ মাত্রায় পারদসহ ৬৮ প্রকার অপরিশোধিত রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার প্রতি লিটার পানিতে প্রায় দশমিক ৪৮ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম রয়েছে। তবে পানিতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম মিশ্রণ পানি পান করলেই মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নৌবাহিনী এক কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের ফলে ঢাকা শহরের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা বিদেশিদের দেখাতে পারি না। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীর তীরে সীমানা পিলার, ওয়াকওয়ে, ইকোপার্ক স্থাপনসহ সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীকে ব্যবহার উপযোগী নদী হিসেবে উপহার দিতে পারব। নদী দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সরকারের পাশাপাশি জনসচেতনতা প্রয়োজন। দখলবাজরা অনেক প্রভাবশালি। নদী যাতে পুনরায় দখল হতে না পারে সেজন্য সব মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।